বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

ভয়ানক কাহিনী পড়ুন দেহে গুলি নিয়ে মৃত্যুর সংগে পাঞ্জাঃ জেলে নজির


বাগেরহাট প্রতিনিধি:
৭বছর ধরে শরীরে গুলি বয়ে বেড়াছে জেলে নজির হাওলাদার জীবন জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে মাছ আহরণ করতেন। সুন্দরবন লাগোয়া শরণখোলা উপজেলার রাজাপুর ভোলারপার গ্রামে তার বাড়ি। বনের ওপর নির্ভরশীল তার পরিবার।
২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি বনদস্যুদের গুলিতে পঙ্গু হন তিনি। সে যে কত জীবিত থাকতেই অসহ্য যন্ত্রণার কষ্টের জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। হুইল চেয়ারে বিছানা বানিয়ে দিন কাটছে তার জীবন।
পিঠে গুলি ও কোমরের নিচে বড় বড় ছিদ্র হয়ে পচে যাচ্ছে। আর পিঠে বন্দুকের গুলির কত যন্ত্রণা তো আছেই, সেটা মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক। চোখের পানি ফেলতে ফেলতে সারাটি দিন কাটে নজির হাওলাদারের।
শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের উত্তর রাজাপুর গ্রামে বসে পঙ্গু নজির হাওলাদারের সাথে।
বললেন, সাত বছর ধরে হুইল চেয়ার ও বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে আমার এখন হাত দিয়ে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরাতে পারছিনা। বাড়ি থেকে বের হয়ে বেশি দূর যেতে পারি না আমি সকালে বের হয়ে স্থানীয় বাজার ও এলাকায় কষ্ট করে ঘুরি সারাদিন।যে যা দেয় তাই দিয়ে সংসার চালাই।
তাতে সংসার আমার চলেনা।
তার, স্ত্রী বলেন : আমার তিন মেয়ে বড় মেয়ে শারমিন বয়স১২বছর মেঝো মেয়ে তায়বা ৯ বছর ছোট মেয়ে রুজিনা ৭বছর মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। আমার একটা ছেলে নেই এক মাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিই হলেন আমার পঙ্গু স্বামী
তিনি আরো বলেন, অর্থের অভাবে ভালভাবে চিকিৎসা করাতে পারেনি। পরিবারের চার সদস্য ও নিজের বেঁচে থাকার জন্য এখন ভিক্ষাই একমাত্র ভরসা।
কিভাবে গুলিবিদ্ধ হন, জানতে চাইলে বলেন- সেবার আমরা স্থানীয় বাবুল মিয়ার ট্রলারে মাছ ধরতে সুন্দরবনে যাই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জিরো পার্টি নামের একটি বনদস্যু বাহিনী মুক্তিপণের দাবিতে ট্রলারসহ আমাদের চারজনকে ধরে নিয়ে যায়। আটকে রাখে ছাফরাখালির চরে। সেখানে ট্রলার মালিক বাবুলের সাথে যোগাযোগ করে দস্যু বাহিনীর লোকেরা। বাবুল দস্যু মোশারফ বাহিনীকে পাঠান তার জেলেদের উদ্ধার করতে। ৯ জানুয়ারি রাতে মোশারফ বাহিনী ও জিরো পার্টির সাথে গোলাগুলি হয়। তখন আমার পিঠে গুলি লাগে। তারপর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফেরার পর আমি জানতে পাই। আমি তখন বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে আছি। জানতে পারি আমাকে এখানে এনে ফেলে রেখে গেছে। কিন্তু চার-পাঁচ দিনেও আমার পিঠের রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি।
আমার স্বজনদের জানালাম- পিঠে এখনও গুলি রয়ে গেছে। তারা বলেন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স না পেলে চিকিৎসকরা অপারেশন করবেন না। পরিবারের লোকেরা পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য থানায় গেলেও থানা থেকে কোন ক্লিয়ারেন্স দেয়নি। তারপরও চিকিৎসকদের হাতে পায়ে ধরে ১৪ দিন থেকেছি ওই হাসপাতালে। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যাই। সেখানেও ১৪ দিন থাকি। কিন্তু পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের অভাবে পিঠের গুলি বের করেননি চিকিৎসকরা। বাধ্য হয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি। গুলির যন্ত্রণা আর পঙ্গুত্ব দুটোই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু আমি মরে গেলে আমার সন্তানদের কি হবে? কে দেখবে ওদের?
নজির কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, সাত বছরে আমি অনেক হাসপাতালে গেছি। কিন্তু পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের অভাবে চিকিৎসকরা আমার গুলি বের করেননি। এলাকার সবাই জানে আমি জেলে। আমি চোর-ডাকাত না। তারপরও আমার চিকিৎসা হয়না। দিনের পর দিন আরো অসুস্থ হয়ে পড়ছি। কোমরের নিচে ও পিঠে কয়েকটি ফুটো রয়েছে। পঁচে ওখান থেকে সব সময় পানি বের হয়। আর প্রথম দিকে সেখানে শুধু ব্যাথা করত। কিন্তু বছর খানেক ধরে সারা শরীরে ব্যাথা করছে। এ ব্যাথা মৃত্যুর যন্ত্রণা থেকেও বেশি আমার ব্যাথা পৃথিবীতে কেউ বুঝলনা
নজিরের স্ত্রী বলেন, সুন্দরবনের বনদস্যুদের সরকার সহযোগিতা করে, পুনর্বাসন করে। কিন্তু বনদস্যুদের গুলিতে আহত আমার স্বামীর জন্য সরকারের কোন দয়া নেই। স্বামীর ভিক্ষার টাকা আমরা খাই। টাকার অভাবে বড় মেয়ের পড়াশুনা বন্ধ করে দিয়েছি। ছোট দুই মেয়ে স্কুলে যেয়ে কারও সাথে মিশতে পারে না, বাবা ভিক্ষা করে তাই। সারাদিন সন্তানরা চোখের পানি ফেলে। ‘ভালো একটা জামা দিতে পারিনা ভালো কোন খাবার খাওইতে পারিনা এ গুলো ছিল আমাদের কপালে লেখা।
মেয়েরা বলেন: আমরা বাবার আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত কিন্তু বাবার এ করুন অবস্থা দেখে পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যাই।
স্বামীর চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন অসহায় এই নারী।
প্রতিবেশীরা বলেন, সরকার বনদস্যুদের মাফ করে দিলেন। তাদেরকে টাকা পয়সা দিল, তাদের সম্মানের সাথে পুনর্বাসন করল। কিন্তু বনদস্যুদের গুলিতে আহত নজিরকে কোন সুবিধা দেওয়া হল না। তাকে যারা গুলি করল তাদেরও কোন বিচার হল না। হুইল চেয়ারে নজিরের কষ্টের জীবন দেখলে যে কারও চোখে পানি চলে আসবে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জাকির হোসেন খান বলেন, নজির হাওলাদার সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে ডাকাতদের গুলিতে পঙ্গু হয়েছে। হুইল চেয়ারে থাকা অবস্থায় যখন তার খিঁচুনি ওঠে তা দেখার মত নয়, খুবই কষ্টের। তিন সন্তান নিয়ে সে খুবই অসহায় জীবন যাপন করে। আমরা তাকে ছোট-খাট যে সহযোগিতা পারি করি। কিন্তু বড় সহযোগিতা করার সামর্থ্য আমাদের নেই।
স্থানীয় রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আছাদুজ্জামান মিলন বলেন, ‘বনদস্যুদের গুলিতে পঙ্গু নজির হাওলাদারকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় তাকে সহযোগিতাও করেছি। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা চিন্তাভাবনাও করছি। তার সুস্থতার জন্য আমরা চেষ্টা করব।
শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, নজির হাওলাদার ২০১৪ সালে বনদস্যুদের গুলিতে আহত হয়েছেন। যার কারণে বিষয়টি আমি অবহিত ছিলাম না। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানলাম। যতদূর সম্ভব তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করব। ‘
বনদস্যুদের গুলিতে আহত পঙ্গু নজির হাওলাদারের চিকিৎসারও আশ্বাস দেন তিনি

শেয়ার করুন

Author:

[সংবাদ, নরম এবং কেবল প্রচার নয়। সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রত্যাশা] [সাংবাদিকতা কখনও নীরব হতে পারে না: এটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এবং তার সর্বশ্রেষ্ঠ] “আমরা শুধু সামনের দিকেই এগুতে পারি; আমরা নতুন দরজা খুলতে পারি, নতুন আবিষ্কার করতে পারি – কারণ আমরা কৌতুহলী। আর এই কৌতুহলই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা”

0 coment rios:

ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য