সকাল প্রায় ৭টা। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংস্কার গ্রুপের (জেএসএস-এমএন লারমা) নেতাকর্মীরা তখনও অনেকে বিছানা থেকে ওঠেননি। কয়েকজন ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করছেন, গোসল করছেন। রান্নার দায়িত্বে থাকা দুই কর্মী বাইরে রান্নাবান্না করছেন। জেএসএস সংস্কারের বড় দুই নেতা জেলা সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি বিমল কান্তি চাকমা ওরফে প্রজিত চাকমা উঠানে চেয়ারে বসে কথা বলছেন। এ সময় জলপাই রঙের জামা সঙ্গে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরিহিত অচেনা দুই লোক ভারী অস্ত্র হাতে বাড়ির উঠানে প্রবেশ করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অতর্কিতে আক্রমণ করে অস্ত্রধারীরা। প্রথমে রতন তঞ্চঙ্গ্যাকে, এরপর বিমল কান্তি চাকমার বুকে গুলি চালায় তারা। এরপর একে এক গুলি করে হত্যা করা হয় আরও চারজনকে। পুরো ঘটনা ঘটে যায় মাত্র পাঁচ মিনিটে। গতকাল মঙ্গলবার বান্দরবানের রাজবিলা ইউনিয়নে রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাগমারা বাজার পাড়ার বাড়িতে কমান্ডো স্টাইলে এ লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন এক নারীসহ তিনজন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী জেএসএস সংস্কারের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু ঘটে গেছে। জেএসএস সংস্কার জেলা কমিটির সভাপতি নিহত রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাড়ির উঠানেই এই হত্যার ঘটনা ঘটে। বাড়ির উঠানে যে দু'জন প্রবেশ করেছে তারাই গুলি চালিয়েছে। বাইরে ছিল তিনজন। তাদের পরনেও জলপাই রঙের পোশাক ও ভারী অস্ত্র ছিল। জেএসএস সংস্কার নেতাদের দাবি, এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে মূল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। হত্যাকারীদের কমান্ডো ট্রেনিং না থাকলে এমন ঘটনা ঘটাতে পারত না। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই ঘটনা ঘটিয়েছে তারা।
তবে হত্যাকাণ্ডে মূল জেএসএস জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংগঠনের জেলা কমিটির তিন নেতা। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
প্রতিপক্ষের গুলিতে একসঙ্গে এতজন নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই বান্দরবানে প্রথম। এর আগে জেলায় এত বড় ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। এর আগে যে ঘটনা ঘটেছে তা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সঙ্গে আওয়ামী লীগের ও মগ লিবারেশন পার্টির মধ্যে। এ ঘটনায় বান্দারবান উত্তপ্ত। স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও ভয়ে আছেন বলে জানা গেছে।
সদর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম জানান, অস্ত্রধারীরা কাছ থেকে গুলি করে সংস্কারের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কারের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি বিমল কান্তি চাকমা ওরফে প্রজিত চাকমা (৬৫), কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ডেবিট মার্মা (৫০), সংস্কার দলের জেলা সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যা (৬০), জয় ত্রিপুরা (৪০), দীপেন ত্রিপুরা (৪২), মিলন চাকমা (৬০)। আহতরা হলেন- নিরু চাকমা (৫০), বিদ্যুত ত্রিপুরা (৩৭) ও এক মার্মা নারী। ঘটনাস্থল থেকে লাশগুলো উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহত তিনজনকে প্রথমে জেলা সদর হাসপাতালে, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সংস্কারের জেলা কমিটির সদস্য উয়াইমং মার্মা বলেন, সকালে রান্না করছিলাম। এ সময় দুই অস্ত্রধারী বাড়ির উঠানে এসে প্রথমে রতন তঞ্চঙ্গ্যাকে ও পরে বিমল কান্তি চাকমাকে গুলি করে। আমার পাশেরজনকে গুলি করতেই আমি দ্রুত পালিয়ে প্রাণে বেঁচে যাই।
নিহত রতন তঞ্চঙ্গ্যার স্ত্রী মিনি মার্মা বলেন, সকালে বাগমারা বাজার থেকে তার স্বামী রান্নার জন্য সবজি কিনে আনেন। এ সময় আমি দুটি চেয়ার উঠানে বের করে দিই। তাতে বসে আমার স্বামী ও বিমল কান্তি চাকমা গল্প করছিলেন। আমি বাড়ির পেছনে কাজ করতে যাচ্ছিলাম। কয়েক মিনিট পর গুলির শব্দ শুনি। উঠানে এসে দেখি আমার স্বামী গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চেয়ারে বসে আছেন। বিমলদা মাটিতে পড়ে আছেন।
এ ঘটনায় সংস্কারের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক উবামং মার্মা বলেন, রতনের পাশের বাড়িটি আমার। ঘটনার সময় আমি বিছানায়। গুলির শব্দ শুনে বিছানায়ই পড়ে থাকি। আমার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে অস্ত্রধারীরা মিলন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। ঘরের দরজা বন্ধ থাকায় আমি কোনমতে বেঁচে যাই। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জেএসএসের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা জড়িত। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পাইহ্লাঅং বলেন, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা ও গুম করার পর থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ভয়ের মধ্যে আছি। এরপর মঙ্গলবারের ঘটনা আমাদের আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে।
পুলিশ সুপার জেরিন আক্তার জানান, কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এখনও জানা যায়নি। তদন্তের পর এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ :খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, বান্দরবানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ছয় নেতাকর্মী হত্যার ঘটনায় খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে দ্বিধাবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-এমএন লারমা)। মঙ্গলবার বিকেলে তারা জেলা শহরের মহাজনপাড়ার সূর্যশিখা ক্লাবের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মুক্তমঞ্চের সামনে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে।
সংগঠনটির জেলা শাখার সহসভাপতি সুভাষ চাকমার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন- কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সিন্ধু কুমার চাকমা, জেলা কমিটির যুববিষয়ক সম্পাদক প্রত্যয় চাকমা এবং পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি দীপন চাকমা। সমাবেশে থেকে বান্দরবানে ছয় নেতাকর্মী হত্যার ঘটনায় তারা সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেন।
এদিকে পিসিজেএসএস-এমএন লারমা অংশের কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা এক বিবৃতিতে জানান, বান্দরবানে নিহতদের মধ্যে বিমল কান্তি চাকমা ওরফে বিধু বাবুর বাড়ি খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার কুড়াদিয়াছড়ায়। অন্যদের মধ্যে উপদেষ্টা কমিটির সদস্য চিংথায়াইয়াঅং মারমা ওরফে ডেভিডের বাড়ি মানিকছড়ি, বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাড়ি বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়াপতং, যুব সমিতির সদস্য রবীন্দ্র চাকমা মিলনের বাড়ি মহালছড়ির খুলরাম পাড়া এবং যুব সমিতির সদস্য রিপন ত্রিপুরা জয় ও জ্ঞান ত্রিপুরা দীপেনের বাড়ি খাগড়াছড়ির গুইমারার বাইল্যাছড়িতে।
সুত্র অনলাইন সংস্করণ
দয়া করে নিউজটি শেয়ার এবং লাইক করুন..

0 coment rios:
ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য