রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

খোলা আকাশের নিচে বসে ওরা স্বপ্ন আঁকে

 


কেউ কুঁড়াতো কাগজ, কেউ বা কাজ করতো বাজারের কোনো সবজির দোকানে। দিনের অধিকাংশ সময় রেলস্টেশন এলাকায় ঘুরে বেড়াতো তারা। শুধু তা-ই নয়, তাদের বসতিও রেললাইনের ধারেই। জীবন কাটে তাদের অনাহারে-অর্ধাহারে। তবে এখন তারা শিক্ষার্থী। তাদের পাঠশালা খোলা আকাশের নিচে। ওই পাঠশালায় বসে তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন আঁকে।

বলছি পথশিশুদের কথা। পথশিশু ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের স্কুলমুখী করেছে বগুড়ার ভিন্নদৃষ্টি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তাদের শিক্ষাদান কার্যক্রমের নাম ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালা। খোলা আকাশের নিচে তাদের পাঠদান কার্যক্রম। এই কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে পথশিশুদের স্কুলমুখী করেছে ভিন্নদৃষ্টি নামে ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

বগুড়া শহরের চেলোপাড়া এলাকায় শিশু পার্কের ভেতর ভিন্নদৃষ্টি নামে স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন চালায় ছিন্নমূল শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম। ২০১৮ সাল থেকে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি।  ওই পাঠশালায় শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হয়। বর্তমানে ২৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে এই কার্যক্রম। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিন্নমূল শিশুসহ রয়েছে দিনমজুর ও রিকশা-ভ্যান চালক ও ভিক্ষুকদের সন্তান। তারা শহরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের স্কুলমুখী করেছে ভিন্নদৃষ্টি নামে ওই সংগঠন। ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালায় নিয়মিত কোচিং করার ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে পথশিশুরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই পাঠশালার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত খেতেও পারে না। কেউ দয়া করে কিছু দিলে খাবার জুটে তাদের। দিনের অধিকাংশই সময়ই খিদে চেপে রাখে তারা। কিন্তু  হঠাৎ করেই ভিন্নদৃষ্টি তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে শুরু করে। এখন ওই শিশুরা খোলা আকাশের নিচে বসে আলো কুড়ায়। পাঠশালায় নিয়মিত শিক্ষার্থী হলো স্কুল থেকে ঝরে পড়া ও হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা। এখন তাদের জীবনে বাসা বাঁধছে নতুন স্বপ্ন। তাদের মধ্যে অনেকেই পড়ালেখা শিখে হতে চায় প্রকৌশলী ও চিকিৎসক।

ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালার শিক্ষার্থী তমা খাতুন। চেলোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে তমা। চেলোপাড়া রেললাইনের ধারে বসতি তার। তমার বাবা ভ্যানচালক। স্কুল থেকে ঝরে পড়েছিল তমা। তাকে স্কুলমুখী করেছে ভিন্নদৃষ্টি সংগঠন।

তমা জানায়, পড়াশোনা করে সে চিকিৎসক করতে চায়। চিকিৎসক হয়ে সে তার মতো শিশুদের পাশে দাঁড়াতে চায়।

একই এলাকার ও বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী আজমিন খাতুন। সে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার স্বপ্ন সে পড়ালেখা শিখে প্রকৌশলী হবে।

ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালার আরেক শিক্ষার্থী হাসনাত। সেও চেলোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। তাকে স্কুলে ভর্তি করায় ভিন্নদৃষ্টি সংগঠন। শিশুকাল থেকেই জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েছে হাসনাত। স্কুল ও ভিন্নদৃষ্টি পাঠশালায় কোচিং করার পর নির্দিষ্ট সময়ে বগুড়া শহর ঘুরে ঘুরে বেলুন বিক্রি করে হাসনাত। তার আয় শুধু তার একার নয়, পরিবারও তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভিন্নদৃষ্টি ও পাঠশালা: ২০১৮ সাল থেকে ভিন্নদৃষ্টি নামের ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শুরু করে ছিন্নমূল শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম। এর আগে, ২০১৬ সালে ওই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংগঠনের সদস্যরাও শিক্ষার্থী। তাদের মধ্য কেউ অনার্স, কেউ বা মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তারা গড়ে তুলে এই সংগঠন। যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা রিংকু রায় অর্ক। তিনি বগুড়া সৈয়দ আহমেদ কলেজ থেকে গণিতে স্নাতক করেছেন। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে আটজন ভিন্নদৃষ্টি পাঠশালায় শিক্ষকতা করেন। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা নিজস্ব টাকায় তারা জনক্যাণমূলক বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন।

ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালার কার্যক্রম চলে সপ্তাহে তিনদিন। মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। তবে বর্তমানে রমজান মাস উপলক্ষে বিকেলে সাড়ে চারটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত তাদের পাঠদান কার্যক্রম চলছে। ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালার শিশুরা আগে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত থাকলেও তারা এখন পড়াশোনায় মনযোগ দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু হাসনাত নামে একজন পড়াশোনার পাশপাশি বেলুন বিক্রি করে। বেলুন বিক্রির আয় দিয়ে সে পরিবারকে সহায়তা করে।

ভিন্নদৃষ্টির পাঠশানার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১৫০ শিশু ভর্তি হয়। করোনাকালীন শিক্ষার্থী কমতে শুরু করে। তবে এই পাঠশানার অনেকে এখন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ।

ভিন্নদৃষ্টির প্রতিষ্ঠাতা রিংকু রায় অর্ক জানান, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভিন্নদৃষ্টি নামে স্বেচ্ছসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছেন তারা। করোনাকালীন পথশিশুসহ কর্মহীন মানুষদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তারা হতদরিদ্র মানুষদের কর্মমুখী করতে আর্থিক সহায়তাও করে থাকেন।

তিনি আরো জানান, পথশিশু ও হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা স্কুলে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের অনেকেই পড়াশোনা ধরে রাখতে পারেনা। ফলে তারা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। এছাড়াও অনেকেই স্কুলেই ভর্তি হয় না। এসব শিশুদের স্কুলমুখী করতে এবং তারা যেন পড়াশোনা করা থেকে ঝরে না পড়ে এই লক্ষে ভিন্নদৃষ্টির পাঠশালা কার্যক্রম শুর করা হয়। অর্থনৈতিক সহায়তা পেলে আরো ভালো কিছু করা যাবে।

cp ডেইলি বাংলাদেশ


শেয়ার করুন

Author:

[সংবাদ, নরম এবং কেবল প্রচার নয়। সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রত্যাশা] [সাংবাদিকতা কখনও নীরব হতে পারে না: এটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এবং তার সর্বশ্রেষ্ঠ] “আমরা শুধু সামনের দিকেই এগুতে পারি; আমরা নতুন দরজা খুলতে পারি, নতুন আবিষ্কার করতে পারি – কারণ আমরা কৌতুহলী। আর এই কৌতুহলই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা”

0 coment rios:

ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য