একের পর এক খুনের ঘটনায় রক্তাক্ত হচ্ছে বগুড়া। আধিপত্য বিস্তার, পূর্ব শত্রুতা ও তুচ্ছ ঘটনার জেরে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। লাশ উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতারে ব্যস্ত সময় পার করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে কিছুতেই থামছে না রক্তের এই ভয়ানক খেলা!
জেলায় শুধুমাত্র গত দুই মাসের (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) ব্যবধানেই হয়েছে ১৪ খুন। ছুরিকাঘাত, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও রড দিয়ে আঘাত করে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়।
জানা গেছে, গত দুই বছরে জেলায় ১৫৯ জনকে হত্যা করা হয়। প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়ে তারা প্রাণ হারান। এর মধ্যে ২০২১ সালে খুন হন ৮২ জন। ২০২০ সালের এ সংখ্যা ছিল ৭৭ জনে।
সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, সমাজে আদর্শহীনতা বিরাজ করলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আর এই বিশৃঙ্খলা থেকেই মানুষের মধ্যে জমতে থাকে অসন্তোষ এবং ক্রোধ। এছাড়াও বিচারহীনতা বা বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা বিরাজমান থাকায় অপরাধ মাত্রাতিরিক্তভাবে সংঘটিত হতে থাকে। একপর্যায়ে খুনের মতো ভয়ানক অপরাধও সংঘটিত হয়।
গত বৃহস্পতিবার ভোরে বগুড়ার ফুলবাড়ী এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) শিল্পনগরীতে দুজন নৈশ প্রহরীকে হত্যা করা হয়। পরদিন শুক্রবার বিকেলে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহতরা বগুড়া সদর উপজেলার সরলপুরের জব্বার আলীর ছেলে ৪৫ বছর বয়সী আব্দুল হান্নান ও শিবগঞ্জ উপজেলার সাগরকান্দি গ্রামের হাসু প্রমাণিকের ছেলে ৬০ বছর বয়সী শামছুল হক।
বিসিক শিল্পনগরীর মাছু অ্যান্ড সন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বর্জ্য জল অপসারণের ট্যাংক থেকে ওই দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা ওই কারাখানার নৈশ প্রহরী ছিলেন। তাদের মাথায় রড দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। পরে কারখানার বর্জ্য অপসারণ ট্যাংকে ফেলে দেয়া হয় তাদের লাশ। কারখানার পিকআপ চালক হোসাইন বিন মিল্লাত ওরফে নিনজার চুরির বিষয় জেনে যাওয়ায় ও তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই নৈশ প্রহরীকে খুন করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
গত বুধবার গাবতলী উপজেলায় নাজিম উদ্দিন নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। গাবতলী পাইলট স্কুলের মাঠে করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচিতে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে পরদিন বুধবার সন্ধ্যায় উপজেলার দাঁড়াইল বাজারে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। ঐদিন রাতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎিসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত নাজিম উপজেলার দাঁড়াইল তরফসরতাজ গ্রামের পূর্বপাড়া গ্রামের ফরিদ উদ্দিনের ছেলে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে সদর উপজেলায় পিকনিকের (বনভোজন) আয়োজনে হামলা চালিয়ে ২৬ বছর বয়সী তুহিন বাবু ওরফে কুইন নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
সদরের নিশিন্দারা খাঁ-পাড়া এলাকার একটি ইউক্যালিপ্টাস গাছের বাগানে এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত তুহিন ঐ এলাকার শহিদুর রহমানের ছেলে। পূর্ব শক্রতার জেরে হামলার শিকার হন তুহিন।
গত ২ জানুয়ারি রাত পৌনে ৮টার দিকে বগুড়া সদরের মালগ্রাম এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নাজমুল হাসান অরেঞ্জকে গুলি করা হয়। পরে শজিমেক হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ জানুয়ারি (সোমবার) রাত পৌনে ১১ টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত ২৮ বছর বয়সী অরেঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক ছিলেন। তিনি মালগ্রাম দক্ষিণপাড়া এলাকার রেজাউল ইসলামের ছেলে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পার্থ সারথী মোহন্ত বলেন, ‘অপরাধ বিজ্ঞানের তত্ত্ব মতে যখন কোনো সমাজে আদর্শহীনতা বিরাজমান থাকে তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। আর এই বিশৃঙ্খল সমাজের মানুষের মধ্যে জমতে থাকে অসন্তোষ এবং ক্রোধ। এই সময়ে যখন সমাজে বিচারহীনতা বা বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা বিরাজমান থাকে তখন অপরাধ মাত্রাতিরিক্তভাবে সংঘটিত হতে থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সর্বপ্রথম আমাদের সমাজে শৃঙ্খলা এবং আদর্শ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
জানতে চাইলে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আলী হায়দার চৌধুরী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের মধ্যে একটি জনবহুল অর্থনৈতিক অঞ্চল বগুড়া। জেলায় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও রহস্য উদঘাটন করা হচ্ছে। এরপরেও ঘটনাবহুল এ জেলায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেখা যায় যে কোনো মাসে বেশ কয়েকটি খুন হচ্ছে আবার কয়েকমাস ধরে খুনের কোনো ঘটনা থাকছে না। সব মিলিয়ে জেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে আছে জেলা পুলিশ।’
C ডেইলি বাংলাদেশ
0 coment rios:
ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য