বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১

রূপগঞ্জে কঠোর লকডাউনেও ডিজে পার্টিরা বেপরোয়া

 


মেঘলা আকাশ। আকাশে ছোপ ছোপ জমে আছে কালো মেঘ। মাঝে মধ্যে শ্রাবনের মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে আছড়ে পড়ছে। বালুনদীতে কিছুক্ষণ পর পরই আসছে আলোকসজ্জায় সজ্জিত ছোট বড় ট্রলার লঞ্জ। ভিতরে কিশোরের দল উচ্চস্বরে গান বাজাচ্ছে। নাচানাচি করছে।

কেউ কেউ মাদকদ্রব্যও সেব করছে। বর্ষা এলেই রূপগঞ্জের খালে বিলে নদীতে এসব লঞ্জ ট্রলারে সংখ্যা বেড়ে যায়। বেড়ে যায় একদল কিশোর নামক ডিজে পার্টির উন্মদনা। গোটা দেশের ন্যায় রূপগঞ্জেও কঠোর লকডাউন চলছে।

স্থলপথে আনছার, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ সেনাবাহিনীর টহল চলমান। তারপরও কঠোর লকডাউন উপেক্ষা করে বেপরোয়া কিশোরের দল মেতে উঠেছে ডিজে পার্টিতে। স্থানীয় প্রশাসণ এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব।

সম্প্রতি রূপগঞ্জের পূর্বাচলে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন হোটেল রেস্টুরেন্ট থেকে এসব বেপরোয়া ডিজে পার্টিও বেশ কিছু সদেস্যকে আটক করলেও কিছুতেই থামছে না ওরা। দিনকে দিন যেন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠছে। হোটেল রেস্টুরেন্ট বাদ দিয়ে এখন নদী পথে চলছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম।
বালুনদী তীরের বাসিন্দা বালুর পাড় এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন, ভাই এসব ডিজে পার্টিও কথা আর কইয়েন না। ওদের অত্যাচারে বাড়িতে বসবাস করাই দায় হয়ে পড়েছে। উচ্চস্বওে মাইক বাজানোর কারনে বাচ্চারা লেখাপড়াও করতে পাওে না।

নদীতীরবর্তী ফকিরখালী এলাকার আলামিন মিয়া বলেন, মামাগো যেভাবে দিনরাত ওরা মাইক বাজায় তাতে ছোট্ট বাচ্চারা হঠাৎ করে ঘুম থেকে আৎকে ওঠে।

এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি লায়ন মীর আব্দুল আলিম বলেন, ডিজে পার্টি নামে কিশোর গ্যাংরা এখন বেপরোয়া। দিন দিন ওরা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠছে। প্রতিনিয়তই ওরা কোনো না কোনো স্থানে অঘটন ঘটাচ্ছে। যার খবর আমরা বিভিন্ন পেপার পত্রিকাসহ টিবি চ্যানেলগুলো দেখতে পাই। ওদেরকে এখনই থামাতে হবে। নচেৎ ভবিষ্যতে বিপদ আরো বাড়বে বই কমবে না।

এ ব্যাপারে রূপগঞ্জের ডা. মেহেদী হাসান বলেন, উচ্চ শব্দে মাইক বাজালে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন নষ্ট হয়। তেমনি বধির হয়ে যেতে পারে মানুষ। হার্ট এ্যাটাকও করতে পারে অনেকে।

জানা যায়, রূপগঞ্জে শতাধিক স্পটে রয়েছে ডিজে ক্লাব। এসব ক্লাবে ২০ থেকে ৩০ জন করে রয়েছে ডিজে তরুণ-তরুণী। ক্লাবগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। গ্লামার গার্ল, লাবণ্যময়ী, লাস্যময়ী, অস্পরী তরুনীরা এসব ক্লাবের নাচনেওয়ালী। লোক দেখানো থাকে কয়েকজন তরুণ। এসব তরুণ-তরুণীরা ক্লাবের হয়ে ভাড়ায় খাটে। সারা বছর যেমন-তেমন, শীত মৌসুমে ডিজে পার্টির বাজার থাকে চাঙা। শীতের মৌসুমের প্রতি মাসেই ৩৫ থেকে ৪০টি পার্টিতে অংশ নিতে পারে একেকজন ডিজে নাচিয়ে।

রূপগঞ্জের আধুনিক স্যাটেলাইট শহরখ্যাত পূর্বাচল, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, তারাবো, দাউদপুর, রূপগঞ্জ সদর, কায়েতপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব ডিজে ক্লাব গড়ে উঠেছে। বাসা ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ডিজে ক্লাব। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিজে পার্টি এখন তরুণ-তরুণী ছাড়াও নানা বয়সীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এক সময় বিশেষ দিনগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিলো ডিজে পার্টি।

এখন পথে-ঘাটে-মাঠে এমনকি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে আয়োজন করা হয়েছে এসব ডিজে পার্টির। এ ছাড়া বিভিন্ন কর্পোরেট শো-গুলো ছাড়িয়ে পারিবারিক অনুষ্ঠানেও ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়। গায়ে হলুদ, জন্মদিন, সুন্নতে খৎনা, বিয়েশাদী ছাড়াও ওপেন কনসার্টে ডিজে পার্টির আয়োজন করা হচ্ছে। একসময় ডিজে পার্টিতে নাচ-গানে সীমাবদ্ধ ছিলো।

শিখানো হতো নাচ-গান। এখন ডিজে পার্টি মানেই উত্তাল নগ্ন নৃত্য। আর সঙ্গে রয়েছে অ্যালকোহল পান। ডিজে পার্টি এখন উপজেলার গাঁও-গেরামে ঠাঁই নিয়েছে। বর্ষাকালে নদীপথে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে তরুণরা ডিজে পার্টির আয়োজন করে থাকে। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদে চলে এসব ডিজে পার্টি। আর শীত মৌসুমে পথে-ঘাটে-মাঠে চলে পার্টি।

সারাদিন বন্ধ থাকলেও সন্ধ্যার পর জমে উঠে এসব ক্লাব। জ্বলে ওঠে লাল-নীল-বেগুনী বাতি। বসে অ্যালকোহল, ইয়াবা আর গাঁজার আসর। ডিজে পার্টিতে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন কয়েকজন বলেন, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ডিজে ক্লাবে সুন্দরী, অস্পরী, লাস্যময়ী তরুনীদের আনাগোনা শুরু হয়। রাত যতো গভীর হয়, ততই জমে উঠে ডিজে পার্টি। নানা শ্রেণীর, নানা পেশার লোক আসতে শুরু করে।

রূপগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আবুল ফয়সাল মোহাম্মদ সায়েদ বলেন, ডিজে পার্টি জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে। খোজ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নদী পথেও অভিযান পরিচালনা করা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহ নুশরাত জাহান বলেন, এসব ডিজে পার্টিতে অপরাধমূলক কর্মকান্ড চলে এটা জানি। শীঘ্রই খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রূপগঞ্জে এসব কিশোর গ্যাং, ডিজে পার্টিদের স্থান হবে না। আমাদের প্রশাসণ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এবার নদী পথেও অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোনো অপরাধীদের স্থান রূপগঞ্জে হবে না। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।


শেয়ার করুন

Author:

[সংবাদ, নরম এবং কেবল প্রচার নয়। সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রত্যাশা] [সাংবাদিকতা কখনও নীরব হতে পারে না: এটি তার সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ এবং তার সর্বশ্রেষ্ঠ] “আমরা শুধু সামনের দিকেই এগুতে পারি; আমরা নতুন দরজা খুলতে পারি, নতুন আবিষ্কার করতে পারি – কারণ আমরা কৌতুহলী। আর এই কৌতুহলই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা”

0 coment rios:

ধন্যবাদ কমেন্ট করার জন্য